স্বাস্থ্য

হঠাৎ নাক দিয়ে রক্ত পড়ার কতিপয় কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও আমাদের করণীয় ২০২৪

হঠাৎ নাক দিয়ে রক্ত পড়ার কতিপয় কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও আমাদের করণীয় ২০২৪ (Sudden Nosebleeds Causes, Symptoms, Treatment)! নাক দিয়ে রক্ত পড়লে আমরা ভাবি হয়তো এটি কোনো অসুখ। যে কোনো বয়সী নারী বা পুরুষের এই ধরণের সমস্যা হতে পারে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে এটি একটি সাধারণ সমস্যা হলেও অনেক সময় যা জটিল রোগের উপসর্গ হিসেবে দেখা দিতে পারে। চলুন জেনে নিই এর কারণ ও আমাদের করণীয় সম্পর্কে।

নাক দিয়ে রক্ত পড়া সমস্যাটি প্রায়শয়ই দেখা যায়। সাধারণত ৬০ শতাংশ মানুষ জীবনে কোনো না কোনো সময় নাক দিয়ে রক্ত পড়ার সমস্যার সম্মুখীন হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি একটি সাধারণ সমস্যা হলেও অনেক সময় এটি জটিল রোগের উপসর্গ হিসেবে দেখা দিতে পারে। চলুন জেনে নিই নাক দিয়ে রক্ত পড়ার কতিপয় কারণ ও আমাদের করণীয় সম্পর্কে।

হঠাৎ নাক দিয়ে রক্ত পড়ার কতিপয় কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও আমাদের করণীয়

রক্ত পড়ার বিভিন্ন কারণ

যে কোনো বয়সের নারী অথবা পুরুষ এ সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। নাক দিয়ে রক্ত পড়ার সমস্যাটি বিভিন্ন কারণে হতে পারে। শুধু যে নাক,কান,গলার সমস্যার কারণে নাক দিয়ে রক্ত পড়ে তাই নয় এছাড়াও শরীরের অন্য অনেক রোগের কারণেও নাক দিয়ে রক্ত পড়তে পারে। নাক দিয়ে রক্ত পড়ার কিছু কারণ নিম্নে দেওয়া হলো-

ক) কতিপয় সাধারণ কারণ  

১। কারও উচ্চরক্তচাপ জনিত সমস্যা থাকলে ।

২। কারও জন্ডিস বা লিভারের প্রদাহ যেমন লিভার সিরোসিসের মতো লিভারের অসুখ থাকলে।

৩। কারও রক্তনালিতে জন্মগত কোন ত্রুটি থাকলেও নাক দিয়ে রক্ত পড়তে পারে।

৪। এছাড়া রক্তের বিভিন্ন রোগ, যেমন- অ্যানেমিয়া, হিমোফিলিয়া, থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া, পারপুরা ইত্যাদি থাকলেও নাক দিয়ে রক্ত পড়তে পারে।

৫। মহিলাদের মাসিক এবং গর্ভাবস্থায় ও অনেকের এ সমস্যা হতে পারে।

৬। Aspirin জাতীয় ওষুধ সেবন করলেও অনেক সময় নাক দিয়ে রক্ত পড়তে পারে।

খ) অন্যান্য কারণ সমূহ

১। কোন কারণে আঘাত পেলে।

২। নাকে অপারেশন হলে।

৩। নাকের সর্দি, সাইনোসাইটিস ইত্যাদি সমস্যা হলে।

৪। নাকের মধ্যে ইনফেকশন যেমন- রাইনাইটিস থাকলে।

৫। নাকের ভিতর টিউমার থাকলে।

৬। নাকের মাঝখানের হাড় অতিরিক্ত বাঁকা হলে।

৭। নাকের মাঝখানের পর্দায় ছিদ্র থাকলে ইত্যাদি।

হঠাৎ নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হলে প্রাথমিক চিকিৎসায় করণীয় :

১। কারও নাক দিয়ে হঠাৎ রক্ত পড়া শুরু হলে তাঁর নাকে চাপ দিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে বসাতে হবে। তারপর বৃদ্ধাঙ্গুল ও প্রথম আঙুল দিয়ে নাকের দুই ছিদ্র জোরে বন্ধ করে দিতে হবে। তাকে বলতে হবে মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে এবং আনুমানিক ১০ মিনিট এভাবে ধরে রাখতে হবে। এ সময় কোন অবস্থাতেই আঙ্গুল ছাড়া যাবেনা, প্রয়োজনে হলে আরও বেশিক্ষণ চাপ দিয়ে ধরে রাখতে হবে।

২। সম্ভব হলে এ সময় তার কপালে, নাকের চারপাশে বরফ ধরে রাখুন। মুখের ভেতরে তালুর যে অংশ নাক বরাবর সেখানে বরফ চাপ দিয়ে ধরুন। এর ফলে রক্ত পড়া তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যাবে।

৩। আর যদি ১৫-২০ মিনিটের পরেও রক্ত পড়া বন্ধ না হয় তাহলে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালের নাক কান গলা বিভাগে গিয়ে তাড়াতাড়ি ডাক্তার দেখাতে হবে।

৪। যদি রোগীর অতিরিক্ত রক্তপাত হয় তাহলে তাকে রক্ত দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

চিকিৎসা:

নাক দিয়ে রক্ত পড়ার চিকিৎসা করতে প্রথমে কী কারণে রক্ত পড়ছে সেটি কারণটি প্রথমে নির্ণয় করে তারপর রোগীকে চিকিৎসা দিতে হবে। নাকের সামনের দিক থেকে রক্তপাত হতে থাকলে তা দ্রুত বন্ধ করা যায় তবে পেছন বা ভিতরের দিক থেকে রক্তপাত হলে অনেক ক্ষেত্রে তা বন্ধ করতে বেশ সময় লাগে। নাকের এন্ডোস্কোপির মাধ্যমেও অনেক সময় রক্তপাতের কারণ নির্ণয় করা হয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে দায়ী রক্তনালিগুলো বন্ধ করে চিকিৎসা করা হয়। নাকের কারণ ছাড়া অন্যান্য কোন শারীরিক কারণে রক্তপাত হলে সংশ্লিষ্ট রোগের চিকিৎসাও করাতে হবে।

নাক দিয়ে রক্ত পড়া প্রতিরোধে কিছু সাবধানতা:

১। নাক, কান, গলার রোগকে কখনো অবহেলা করা যাবেনা।

২। এছাড়া আগে থেকেই নিজের রক্তের গ্রুপ জেনে রাখুন যাতে জরুরী মুহূর্তে রক্ত দিতে হলে ঝামেলা না হয়।

৩। নাক দিয়ে রক্ত পড়তে থাকলে শোয়া যাবেনা।

৪। অযথা নাকে হাত লাগানোর অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।

৫। নিজেদের ও শিশুদের নখ ছোট করে রাখতে হবে।

৬। শুষ্ক মৌসুমে অর্থাৎ শীতকালে নাক যাতে অতিরিক্ত শুষ্ক না হয়ে যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এজন্য নাকের সামনের দিকে পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করা যেতে পারে।

কেন নাক দিয়ে রক্ত পড়ে?

– নাকের ভেতর কোনোভাবে আঘাত পেলে রক্তপাত হতে পারে।

– নাকের বিভিন্ন টিউমারের কারণে হতে পারে।

– অপারেশনজনিত কোনো কারণ থেকে হতে পারে।

– নাকের সর্দি বা সাইনোসাইটিসের কারণে হতে পারে।

– নাকের বিভিন্ন ধরনের ইনফেকশনের কারণেও হতে পারে।

– নাকের মাঝখানের হাড় অতিরিক্ত বাঁকা হওয়ার কারণে হতে পারে।

– নাকের মাঝখানের পর্দা ছিদ্র হলে রক্তপাত হতে পারে।

এ ছাড়া কয়েকটি সাধারণ কারণে নাক দিয়ে রক্ত বের হতে পারে। সেগুলো হলো—

– কোনো ওষুধ (এসপিরিস) সেবনের জন্য

– উচ্চ রক্তচাপের জন্য

– নাকের রক্তনালির কিছু জন্মগত ত্রুটির জন্য

– মাসিকের সময় অথবা গর্ভাবস্থার সময়

– জন্ডিস বা লিভার প্রদাহ এবং লিভার সিরোসিসের জন্য

– রক্তের বিভিন্ন রোগের জন্য হতে পারে। যেমন—প্লাস্টিক অ্যানমিয়া, হিমোফিলিয়া, থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া, পারপুরা।

নাক দিয়ে রক্ত পড়লে কী করবেন?

হঠাৎ নাক দিয়ে রক্ত পড়লে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে যান। এটি না করে প্রথমে সোজা হয়ে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে চেয়ারে বসুন। আঙুল দিয়ে নাকের দুটি ছিদ্র বন্ধ করে রাখুন। এ সময়টাতে মুখ দিয়ে শ্বাস নিন। কিছু সময় এভাবে থাকার পরও যদি দেখেন রক্ত পড়া কমছে না, তাহলে আঙুল ছাড়বেন না; আরও বেশি সময় চাপ দিয়ে ধরে রাখুন। যদি পারেন তাহলে কপালে ও নাকের চারপাশে বরফ দিতে পারেন, তাহলে রক্ত পড়া দ্রুত বন্ধ হবে।

যদি এভাবেও কাজ না হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে রক্ত পড়তে থাকে, তাহলে বিলম্ব না করে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের কাছে চলে যান। একটা বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখবেন, যখন নাক দিয়ে রক্ত পড়বে তখন কোনোভাবেই শোবেন না। কারণ, এ সময় রক্ত ফুসফুসে গিয়ে মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। আর রক্ত পড়া যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নাক পরিষ্কার করতে যাবেন না, কেননা পুনরায় রক্ত পড়া শুরু হতে পারে।

নাকের রক্ত পড়া প্রতিরোধে যা করবেন

– অনেকেরই খুঁটে খুঁটে নাক দিয়ে ময়লা বের করার অভ্যাস আছে। তবে নাক দিয়ে রক্ত পড়া প্রতিরোধ করতে কোনোভাবেই নাক খুঁটা যাবে না। যদি এটা করেন, তাহলে নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হতে পারে।

– নাকের হাড়ে কোনো সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ খান, না হলে হঠাৎ করে নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হতে পারে।

– বয়স্করা নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন। যত দিন নিয়ন্ত্রণে থাকে তো ভালো, আর না থাকলে অবশ্যই ওষুধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখুন। অনেক ক্ষেত্রে রক্তচাপের কারণে নাক দিয়ে রক্ত পড়তে পারে। তাই যখনই নাক দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করবে, তখন ব্লাড প্রেশার চেক করবেন।

– যারা হৃদরোগে আক্রান্ত, তাদের ওষুধ খাওয়ার মাধ্যমে অনেক সময় নাকের রক্ত পড়তে পারে। তাদের যদি নাক দিয়ে রক্ত পড়ে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং জানুন, কী কারণে এমনটি হচ্ছে।

– নাকের ভেতরের ময়লা বের করার জন্য অনেকে নাক খোঁচাখুঁচি করেন। এর ফলেও নাক দিয়ে রক্ত পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই খোঁচাখুঁচি না করে দিনে ৩-৪ বার নরসল ড্রপ ব্যবহার করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button