অগ্নি নিরাপত্তা

অগ্নিকাণ্ডের কারণ, প্রতিরোধ ও তাৎক্ষণিক করণীয় (Causes of Fire Prevention and Immediate Action)

অগ্নিকাণ্ডের কারণ, প্রতিরোধ ও তাৎক্ষণিক করণীয় (Causes of Fire Prevention and Immediate Action)! অগ্নিকাণ্ড এমন একটি দুর্ঘটনা যা মুহূর্তের মধ্যে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি, প্রাণহানি এবং আর্থিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বাড়ি, অফিস, বাজার, শিল্পকারখানা কিংবা জনসমাগমস্থল—যেখানেই আগুন লাগুক না কেন, দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তা ভয়াবহ রূপ নিতে সময় লাগে না। অথচ অগ্নিকাণ্ডের অধিকাংশ ঘটনাই সচেতনতা ও সঠিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এড়ানো সম্ভব। এই লেখায় আমরা জানব অগ্নিকাণ্ডের কারণ, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং তাৎক্ষণিক করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত।
অগ্নিকান্ডের কারন, প্রতিরোধ ও তাৎক্ষনিক করণীয়

অগ্নিকান্ডের কারণ [Reasons of Fire]

বিভিন্ন কারণে অগ্নিকান্ড সংগঠিত হয়ে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অগ্নিকান্ড সংগঠিত হয় বৈদ্যুতিক কারণে। অগ্নিকান্ডের উৎস গবেষনা করে অগ্নিকান্ডের মূল কারণসমূহকে দু ভাগে ভাগ করা যায়। যেমনঃ
১. কর্মক্ষেত্রে অগ্নিকান্ড সংগঠিত হবার কারণসমূহ, (Causes of fires in the workplace)
২. বাড়ীতে অগ্নিকান্ড সংগঠিত হবার কারণসমূহ, (Causes of house fires)

অগ্নিকাণ্ড কাকে বলে?

যখন কোনো দাহ্য পদার্থ অক্সিজেন ও তাপের সংস্পর্শে এসে অনিয়ন্ত্রিতভাবে জ্বলে ওঠে এবং আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাকে অগ্নিকাণ্ড বলা হয়। এটি প্রাকৃতিকভাবেও ঘটতে পারে (যেমন বজ্রপাতের কারণে বনাঞ্চলে আগুন), আবার মানুষের অসাবধানতাজনিত কারণেও ঘটতে পারে।

অগ্নিকাণ্ড সাধারণত তিনটি উপাদানের ওপর নির্ভর করে:

  1. দাহ্য পদার্থ

  2. অক্সিজেন

  3. তাপের উৎস

এই তিনটির যেকোনো একটি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে আগুন লাগা প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।


অগ্নিকাণ্ডের প্রধান কারণসমূহ

অগ্নিকাণ্ডের কারণকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায় — (১) মানবসৃষ্ট কারণ(২) প্রাকৃতিক কারণ

১. মানবসৃষ্ট কারণ

  1. বিদ্যুতের শর্ট সার্কিট
    পুরনো বা ত্রুটিপূর্ণ তার, অননুমোদিত সংযোগ এবং ওভারলোডের কারণে শর্ট সার্কিট হয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়।

  2. গ্যাসের লিকেজ
    রান্নাঘর বা শিল্পকারখানায় গ্যাস লিক হয়ে আগুন ধরে যেতে পারে, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

  3. ধূমপান বা খোলা আগুনের অসাবধান ব্যবহার
    সিগারেট বা দেশলাইয়ের অসাবধান ব্যবহারেও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

  4. রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের ভুলভাবে সংরক্ষণ
    পেট্রোল, ডিজেল, থিনার ইত্যাদি দাহ্য পদার্থ নিরাপদে না রাখলে তা বিস্ফোরণ ও আগুনের ঝুঁকি বাড়ায়।

  5. দুর্বল অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা
    ভবন নির্মাণে পর্যাপ্ত ফায়ার এক্সিট, এলার্ম সিস্টেম ও ফায়ার এক্সটিংগুইশার না থাকলে আগুন লাগলে তা নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়।

২. প্রাকৃতিক কারণ

  1. বজ্রপাত ও প্রবল গরম
    গ্রামাঞ্চল বা বনাঞ্চলে বজ্রপাত বা অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে আগুন লেগে যায়।

  2. ভূমিকম্প বা বিস্ফোরণ
    এসব প্রাকৃতিক বা দুর্ঘটনাজনিত ঘটনায়ও অগ্নিকাণ্ড হতে পারে।


অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে করণীয়

অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা (Preventive Measures) সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো 👇

১. বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

  • মানসম্মত তার, সুইচ ও সার্কিট ব্রেকার ব্যবহার করা।

  • নির্দিষ্ট সময় পর পর ইলেকট্রিক সংযোগ পরীক্ষা করা।

  • ওভারলোড এড়াতে একাধিক হাই-পাওয়ার ডিভাইস একই প্লাগে না লাগানো।

২. গ্যাস ব্যবস্থার নিরাপত্তা

  • প্রতিদিন রান্না শেষে গ্যাসের রেগুলেটর বন্ধ রাখা।

  • লিকেজ হলে সাথে সাথে জানালা খুলে দেওয়া, আগুন না জ্বালানো।

  • নির্দিষ্ট সময় অন্তর পাইপ ও সংযোগ পরীক্ষা করা।

৩. দাহ্য পদার্থ সঠিকভাবে সংরক্ষণ

  • দাহ্য পদার্থ বদ্ধ ও নিরাপদ স্থানে রাখা।

  • শিশু ও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রাখা।

  • গরম বা আগুনের উৎস থেকে দূরে সংরক্ষণ।

৪. ভবনের অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা

  • ফায়ার এক্সটিংগুইশার, অ্যালার্ম ও স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম স্থাপন করা।

  • ফায়ার এক্সিট বা জরুরি সিঁড়ির ব্যবস্থা রাখা।

  • নিয়মিত ফায়ার ড্রিল ও প্রশিক্ষণ দেওয়া।


অগ্নিকাণ্ডের সময় তাৎক্ষণিক করণীয়

অগ্নিকাণ্ডের প্রাথমিক পর্যায়ে দ্রুত ও সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে বড় বিপর্যয় এড়ানো যায়। নিচে কয়েকটি তাৎক্ষণিক করণীয় ধাপে ধাপে দেওয়া হলো 👇

  1. তৎক্ষণাৎ এলার্ম বাজানো বা চিৎকার করে সবাইকে সতর্ক করা।

  2. বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল সুইচ বন্ধ করে দেওয়া।

  3. ছোট আগুন হলে ফায়ার এক্সটিংগুইশার দিয়ে নেভানোর চেষ্টা করা।

  4. বড় আগুন হলে দ্রুত এলাকা খালি করে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া।

  5. লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়ি দিয়ে নামা।

  6. ধোঁয়া বেশি হলে ভেজা কাপড় মুখে দিয়ে নিচু হয়ে বের হওয়া।

  7. প্রয়োজনে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া ও আহতদের হাসপাতালে পাঠানো।


আইনি ও প্রশাসনিক দিক

বাংলাদেশে ভবন, বাজার ও শিল্প কারখানায় অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বিল্ডিং কোড ও ফায়ার সেফটি বিধিমালা রয়েছে। এগুলো মানা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম না মানার কারণেই বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তাই সরকার, প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক — সবার সম্মিলিত সচেতনতা প্রয়োজন।


উপসংহার

অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা ও প্রস্তুতি। বৈদ্যুতিক সংযোগ, গ্যাস ব্যবস্থাপনা, দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণ এবং ফায়ার সেফটি সিস্টেম ঠিকভাবে অনুসরণ করলে অধিকাংশ দুর্ঘটনাই রোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডের সময় দ্রুত পদক্ষেপ ও প্রাথমিক যন্ত্রপাতির সঠিক ব্যবহার প্রাণ ও সম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই এখনই সময় অগ্নি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলার। 

 
 

অগ্নিকান্ড সংগঠিত হলে তাৎক্ষনিক ও পরবর্তিতে কি করবো? (যা অবশ্যই জানতে হবে) – What to Do Immediately and Next If The Fire is Organized?

যে কোন সময় অগ্নিকান্ড সংগঠিত হতে পারে তাই সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে আপনি যদি অগ্নি-নিরাপত্তা কর্মী না হন সে ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে আপনার যাওয়া ঠিক হবে না। এ কাজটি অভিজ্ঞ লোকদের হাতে ছেড়ে দিয়ে তাদের সাহায্য করুন ও অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে থেকে চেষ্টা করুণ।
হঠাৎ আগুন লাগলে সাথে সাথে ও পরে কি কি করতে হবে আসুন এবার তা জেনে নেই।
  • কোথাও আগুন লাগলে সাথে সাথে বৈদ্যুতিক মূল সংযোগ বিছিন্ন করে দিতে হবে,
  • অগ্নিকান্ডের সময় যতটা সম্ভব ধীর-স্থীর ও শান্ত থাকতে হবে,
  • ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জরুরী টেলফোন নাম্বারটি সকলের মুখস্ত রাখতে হবে এবং দ্রুত তাদের জানাতে হবে,
  • ফারায় সার্ভিসের গাড়ি আসার পূর্ব পর্যন্ত নিরাপদ দূরত্বে থেকে অবশ্যই আগুন নেভানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে,
  • অগ্নি নির্বাপর সামগ্রী ব্যবহার করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে হবে,
  • বৈদ্যুতিক লাইনে, তৈল জাতীয় আগুনে, কোন মেশিন বা যন্ত্রে পানি দেয়া যাবে না,
  • সকলকে সতর্ক করার জন্য ফায়ার এলার্ম বাজাতে হবে বা বিশেষ কোন সিগন্যাল দিতে হবে,
  • কোনভাবেই তাড়াহুড়ো করা যাবে না। এতে করে পরে গিয়ে বড় রকম আঘাত পাওয়া, এমন কি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই মাথা ঠান্ডা রেখে কি করতে হবে তা ঠিক করা,
  • এলার্ম অথবা সিগন্যাল বাজানো শেষ হলে সকলকে সারিবদ্ধ ভাবে বের হয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসতে হবে,
  • ফ্লোর ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে গেলে হামাগুড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে বের হয়ে আসতে হবে। সম্ভব হলে ভেজা কাপরের টুকরো,রুমাল বা তোয়ালে দিয়ে মুখ ও নাক বেঁধে হামাগুড়ি দিয়ে বের হয়ে আসতে হবে। সাথে সাথে বের হওয়া সম্ভব না হলে গ্যাস মাস্ক পরে অপেক্ষা করতে হবে,
  • গায়ে বা কাপড়ে আগুন লাগলে কখনই দৌড়াবেন না। কারন বাতাসের অক্সিজেন আগুন জ্বলে উঠতে সাহায্য করে। তাই দ্রুত মাটিতে শুয়ে পড়ুন এবং দু হাত মুখমন্ডলের উপর রেখে গায়েয় আগুন নিবে না যাওয়া পর্যন্ত গড়াগড়ি দিতে থাকুন।

বীমা দাবি আদায়ের তাৎক্ষনিক করণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম-নীতি সমূহ – Immediate and Important Rules and Regulations for Collecting Insurance Claims

হঠাৎ করেই আগ্নিকান্ড সংগঠিত হয় এবং দ্রুত তা ছড়িয়ে পরে বিধায় তার ক্ষয়-ক্ষতির পরিমান অনেক আংশেই বেশি হয়। কোন কোন সময় এ ক্ষতি পূরণ করা সম্ভবও হয় না। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের মালিক বা মালিকগন যদি বীমা পলিসি গ্রহণ করে থাকেন তবে এ ক্ষতি-ক্ষতি কিছুটা কাটিয়া উঠা যায়।
অগ্নি দুর্ঘটনা বিষয়ে তাৎক্ষনিক মালিক বা মালিকগনকে কি করতে হবে এ অংশে তা আলোচনা করা হবে। যে সকল ব্যবস্থা নিতে হবেঃ
  • যতো দ্রুত সম্ভব নিকটবর্তী থানায় আগ্নিকান্ড বিষয়ে ডায়রি করতে হবে,
  • অগ্নি দুর্ঘটনার ক্ষতিগ্রস্ত মালামালের ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে হবে,
  • স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকা, ইলেকট্রনিক মিডিয়া কে জানাতে হবে,
  • দ্রুত সংশ্লিষ্ট ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীকে জানাতে হবে,
  • প্রয়োজনে বায়ার ও অন্যান্য সহায়ক দ্রবাদি সরবরাহকারীদের অবহিত করতে হবে,
  • ক্ষতিগ্রস্থ মোট সম্পদের একটি আনুমানিক তালিকা করে তা সংরক্ষণ করতে হবে,
  • বীমা দাবী আদায়ে এ সংক্রান্ত সনদপত্র সংগ্রহ করতে হবে,
  • ফায়ার সার্ভিস থেকে ক্ষয়-ক্ষতির প্রতিবেদন সংবলিত একটি সনদপত্র নিতে হবে,
  • ক্ষতিগ্রস্থ কাওরখানার বা স্থানের সর্বশেষ অবস্থা অবহিত করার জন্য নির্ধারিত বিভাগকে পরিদর্শনের অনুরোধ করতে হবে,
  • ভ্যাট অব্যাহতি পেতে চাইলে ভ্যাট অফিসে সংশ্লিষ্ট সকল সার্টিফিকেট,দলিল পত্র জমা দিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button