আগুন কি | আগুনের প্রকারভেদ ও তার বিস্তার প্রক্রিয়া
আগুন মানব সভ্যতার জন্য যেমন আশীর্বাদ, তেমনি অসচেতন ব্যবহারে এটি হতে পারে ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ আগুন ব্যবহার করে আসছে রান্না, তাপ উৎপাদন ও শিল্পকার্যে। কিন্তু আগুনের প্রকৃতি, ধরন এবং বিস্তার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়। তাই এই লেখায় আমরা সহজভাবে জানব — আগুন কী, এর প্রকারভেদ এবং আগুন ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত।

আগুন কি? আগুন কিভাবে সৃষ্টি হয়? What is Fire? How Fire is Created?
আগুন হল একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া, যেখানে কোনো দাহ্য পদার্থ অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে তাপের মাধ্যমে জ্বলে উঠে এবং আলো ও তাপ উৎপন্ন করে। এই বিক্রিয়াকে বলা হয় দহন প্রক্রিয়া (Combustion)।
আগুন লাগার জন্য তিনটি মৌলিক উপাদান দরকার, যাকে Fire Triangle বলা হয়:
দাহ্য পদার্থ (Fuel) – যেমন কাঠ, কাগজ, তেল, গ্যাস ইত্যাদি
তাপ (Heat) – জ্বলার প্রাথমিক শক্তি সরবরাহ করে
অক্সিজেন (Oxygen) – দহনকে অব্যাহত রাখে
এই তিনটির যেকোনো একটি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে আগুন নিভানো সম্ভব।

আগুনের প্রকারভেদ
আগুনের ধরণ বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতিটি ধরনের আগুন নেভানোর পদ্ধতি আলাদা। আন্তর্জাতিকভাবে আগুনকে প্রধানত ৫টি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়
১. ক্লাস A (Class A) – সাধারণ কঠিন পদার্থের আগুন
এই ধরনের আগুন কাঠ, কাগজ, কাপড়, রাবার, প্লাস্টিক ইত্যাদি কঠিন দাহ্য পদার্থে ঘটে।
সাধারণ পানি বা ওয়াটার-বেসড ফায়ার এক্সটিংগুইশার দিয়ে নেভানো কার্যকর।
২. ক্লাস B (Class B) – দাহ্য তরলের আগুন
পেট্রোল, ডিজেল, পেইন্ট, থিনার, কেরোসিন ইত্যাদি দাহ্য তরলে আগুন লাগলে সেটি ক্লাস B আগুন।
ফোম বা CO₂ ফায়ার এক্সটিংগুইশার সবচেয়ে উপযোগী।
৩. ক্লাস C (Class C) – দাহ্য গ্যাসের আগুন
এলপিজি, প্রোপেন, মিথেন গ্যাসের লিকেজ থেকে আগুন লাগলে সেটি ক্লাস C।
CO₂ বা Dry Chemical Powder (DCP) ব্যবহার করা হয়।
৪. ক্লাস D (Class D) – ধাতব আগুন
সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়ামের মতো ধাতুতে আগুন লাগলে এটি ক্লাস D আগুন।
বিশেষ ধরণের Dry Powder ব্যবহার করতে হয়।
৫. ক্লাস E / Electrical Fire – বৈদ্যুতিক আগুন
শর্ট সার্কিট বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ত্রুটি থেকে আগুন লাগলে সেটি এই শ্রেণিতে পড়ে।
CO₂ ফায়ার এক্সটিংগুইশার সবচেয়ে কার্যকর। কখনোই পানির ব্যবহার করা যাবে না।
আগুনের বিস্তার প্রক্রিয়া
আগুন একবার লাগলে যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, এটি খুব দ্রুত চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। আগুন ছড়িয়ে পড়ার প্রধান তিনটি প্রক্রিয়া আছে
১. Conduction (পরিবহণ)
একটি পদার্থের মাধ্যমে তাপ এক দিক থেকে আরেক দিকে সঞ্চারিত হয়।
যেমন: লোহার রডের একপ্রান্তে আগুন দিলে অন্যপ্রান্ত গরম হয়ে যাওয়া।
২. Convection (সংবহন)
গরম বাতাস ও ধোঁয়া উপরের দিকে উঠে আশেপাশের জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে আগুন দ্রুত অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে যায়।
ভবনের ভেতরে আগুন সাধারণত এই প্রক্রিয়ায় দ্রুত ছড়ায়।
৩. Radiation (বিকিরণ)
তাপ বিকিরণের মাধ্যমে আশেপাশের বস্তুর তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং আগুন লাগার উপযুক্ত অবস্থা তৈরি করে।
যেমন: চুলার পাশে রাখা দাহ্য বস্তুতে তাপ লেগে আগুন ধরে যাওয়া।
আগুনের বিস্তারকে প্রভাবিতকারী কিছু উপাদান
দাহ্য পদার্থের ঘনত্ব ও অবস্থান
বাতাসের প্রবাহ বা বাতাসের গতি
স্থাপনার কাঠামো (যেমন ভেন্টিলেশন বা খোলা জায়গা)
তাপের উৎসের ধরন ও শক্তি
প্রাথমিক অবস্থায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না
তাই আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত প্রতিক্রিয়া না দিলে এই তিনটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আগুন মুহূর্তেই ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা
আগুন প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা ও প্রস্তুতি।
ঘরে ও কর্মস্থলে সঠিক ধরনের ফায়ার এক্সটিংগুইশার থাকা জরুরি।
বৈদ্যুতিক সংযোগ, গ্যাস লাইন ও দাহ্য পদার্থ নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত।
জরুরি বের হওয়ার পথ (Fire Exit) খোলা ও ব্যবহারযোগ্য রাখতে হবে।
প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপণ প্রশিক্ষণ নেওয়া অত্যন্ত উপকারী।
আগুন বিস্তারের প্রক্রিয়া [Process of Thermal Expansion]
পরিবহণ
পরিচলণ
বিকিরণ
আগুন সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে এবং সময়মতো ব্যবস্থা নিতে পারলে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। আগুন কী, আগুনের প্রকারভেদ এবং বিস্তার প্রক্রিয়া জানা থাকলে আমরা নিজেরা যেমন নিরাপদ থাকতে পারি, তেমনি অন্যদেরও সহায়তা করতে পারি। আগুনকে ভয় নয়—বরং বুঝে, সতর্ক থেকে এবং সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে আগুন প্রতিরোধই হতে পারে নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় উপায়।







